ম্যাচের নায়ক নিঃসন্দেহে ছক্কা মেরে ম্যাচ জেতানো মাহমুদউল্লাহ, মাত্র দুই ওভার বল করে শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ দুই উইকেট তুলে নেওয়া আর বিচক্ষণ অধিনায়কত্ব করা সাকিবও। তবে আরেকজন মাঠে না থেকেও দলের আবেগী মুহূর্তে মাথা ঠাণ্ডা রেখে মাহমুদউল্লাহকে ব্যাটিংয়ে ফেরত পাঠিয়ে যে ভূমিকাটি কাল পালন করলেন সেই সুজনকেও নায়ক বলা যায়! তবে অলক্ষ্যে এদিন ওপারে চলে যাওয়া মানজারুল রানাও ছিলেন। তার চলে যাওয়ার দিনেই যে আবারো জয়ের দেখা পেল
বাংলাদেশ!

তুমুল উত্তেজনায় ঠাসা অঘোষিত সেমিফাইনাল ম্যাচে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মাহমুদউল্লাহ। তার নিজের বিচারেই এটি তার সেরা ইনিংস। তিনি যখন মাঠে নামলেন কঠিন সমীকরণে পড়ে গেছে তখন দল। অথচ প্রথম ১২ ওভার শেষও জয়ের সুবাস পাচ্ছিলো বাংলাদেশ। ওপেনিং জুটি স্বল্পস্থায়ী হওয়ার পরও তামিম-মুশফিক ছিলেন বলে টেনশন ছিল না। কিন্তু তারপর মাত্র ১৫ বলের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে ১০৯ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে জয়ের পথ কঠিন করে ফেললো বাংলাদেশ। সাব্বির-সৌম্যরা আবারো উইকেটে টিকে থাকতে ব্যর্থ। সাব্বিরকে ওয়ান ডাউনে নামিয়ে সাকিব যে জুয়াটা খেললেন তা কাজে লাগেনি। সৌম্য আগের ম্যাচের মতোই নড়বড়ে। ২৮ রান করে যখন মুশফিক বিদায় নিলেন শ্রীলঙ্কান দর্শকরা তখন উন্মাতাল নাগিন ড্যান্স দিচ্ছিলেন। ম্যাচটা কি হাত ফসকে বেরিয়ে গেলো? তবে ক্রিজে তখনও তামিম ছিলেন বলেই ভরসা হারায়নি বাংলাদেশ। ৪১ বলে ফিফটি করা তামিম ঠিক পরের বলেই আউট। এরপর অধিনায়ক সাকিব যখন মাঠে এলেন ৩১ বলে ৫১ রানের সমীকরণ মাথায় নিয়ে প্রত্যাশার পারদ আবার ফুলে উঠলো। তবে ৯ বল খেলে ৭ রান করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন পুরো ফিট তিনি নন। তা তিনি পরে স্বীকারও করেছেন।
১২ বলে ২৩ রানের সমীকরণ মিলাতে মাঠে মাহমুদউল্লাহ। এমন কঠিন মুহূর্তেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে খেলার সামর্থ্য তার আছে তা আগে থেকেই জানা। কাল সেই জানা বিষয়টাকেই মাঠে প্রতিফলিত করার কঠিন চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে তার সঙ্গী হতে পারেন নি কেউ। শেষ ওভারের আগের ওভারে মিরাজ তড়িঘড়ি করে সিঙ্গেল নিতে গিয়ে রানআউট হলেন, ফল নন-স্ট্রাইক প্রান্তে মাহমুদউল্লাহ। শেষ ওভারে ১২ রান দরকার। প্রথম দুই বলে কোন রান হলো না, উল্টো বল মিস করে রান নিতে গিয়ে পড়িমড়ি করে ছুটলেন মুস্তাফিজ। আবারো আউট। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ ততক্ষণে স্ট্রাইকিং প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। আর তারপরই ওই নাটক। লঙ্কান বোলার উদানা পরপর দুই বাউন্সার দিলেও নো-বল দিলেন না শ্রীলঙ্কান আম্পায়ার। লেগ আম্পায়ার নো বল দিতে গিয়েও দিলেন না। এমন ঘটনায় হতবিহবল মাহমুদউল্লাহ। মাহমুদউল্লাহ আম্পায়ারদের সাথে কথাও বললেন। টিভি রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা গেলো দুটোই বাউন্সার ছিল। পানি নিয়ে ভেতরে ঢোকা অতিরিক্ত ফিল্ডার সোহান ও রাহী তর্কে জড়ালেন শ্রীলঙ্কান ফিল্ডারদের সঙ্গে। আর তখনই মাঠের পাশে নেমে এলেন সাকিব। একটু পরেই মাঠে জড়ো হলেন আরও কজন।

মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত সাকিব ব্যাটসম্যানদের চলে আসার ইঙ্গিতও দিলেন তিনি। তাতে সায় দিয়ে হেলমেট খুলেও ফেলেছিলেন মাহমুদউল্লাহ। ঠিক সেই মুহূর্তে পার্শ্বনায়কের ভূমিকায় আলোচিত-সমালোচিত বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন। সাকিবকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠাণ্ডা করলেন। যদিও সাকিব তাতে খুশি হতে পারেন নি, বরং উত্তেজিত অবস্থায় ড্রেসিং রুমের দিকে যাত্রা করলেন। ওদিকে মাঠে থাকা মাহমুদউল্লাহকে নিবৃত করে ম্যাচ শেষ করে আসতে বললেন। আর এরপর যা হলো তা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসেই গর্ব করার মতো বিষয় হয়ে থাকবে। ঠাণ্ডা মাথার মাহমুদউল্লাহ আবেগ সংবরণ করে খেলায় মনোযোগ দিলেন। হাতে তখন ৪ বল, রান প্রয়োজন ১২। ক্রিজে ফিরে মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই চার মেরে জবাবটা ব্যাটেই দিলেন। পরের বলে দুই। আর শেষ বলের আগের বলে ছক্কা মেরে ম্যাচটা এক বল হাতে রেখে জিতিয়ে দিলেন মাহমুদউল্লাহ। ভাগ্যিস সাকিবের ডাকে সেসময় মাঠ ছেঁড়ে চলে আসেন নি দুই ব্যাটসম্যান। নাহলে ম্যাচটা হেরে যেত বাংলাদেশ। আর লেখাও হতো না এই বীরত্বগাঁথা। মিডিয়ার উপর অভিমান করা সুজন কালকের ম্যাচে যে ভূমিকা রেখেছেন তাতে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই।
শিরোনামে মানজারুল রানা কেন এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ, কালকের এই ঐতিহাসিক জয়ের দিনে মানজারুল রানা যে বাংলাদেশ দলের ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিলেন। ১১ বছর আগে এই দিনেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান জাতীয় দলের সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানা। তার পরদিনই ২০০৭ বিশ্বকাপে
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ ছিল। তার অমন হুট করে চলে যাওয়ায় শোকাক্রান্ত বাংলাদেশ দল সেদিন তাকে হৃদয়ে ধারণ করে মাঠে নেমে ভারতের মতো কঠিন প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিয়েছিল। তার অভিন্নহৃদয়ের বন্ধু মাশরাফি সেদিন আবেগ সংবরণ করে ওপারে চলে যাওয়া বন্ধুকে জয় উপহার দিতে পুরো দলকে একাগ্র করে তোলেন। মাশরাফি একাই উড়িয়ে দিলেন শচীন, সৌরভ, দ্রাবিড়ের ভারতকে। সঙ্গ দিলেন ঠিক তিনটি হাফসেঞ্চুরি করে সাকিব-তামিম-মুশফিক । আর তাতেই সেই দুর্দান্ত জয়। ওই জয়ের পাঁচ বছর পর ঢাকায় এশিয়া কাপেও এই একই দিনে শচীনের সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি হওয়ার দিনে ভারতকেই আবারো হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। ঢাকায় ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে একই দিনে আফগানিস্তানকে উড়িয়ে দেয় টাইগাররা। আর এবার শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দেওয়া। মানজারুল যেন অলক্ষ্যে থেকেও ছিলেন এই ম্যাচে। তিনি আমাদের শোকের উপলক্ষ্য, আবার জয়েরও। তার মৃত্যুদিনে নিজেদের উজাড় করে দিয়েই খেলেছে বাংলাদেশ।

নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় বাংলাদেশী নাগরিকদের হারিয়ে শোকে মুহ্যমান বাংলাদেশ। একটা জয় তাতে প্রলেপ দিতে যথেষ্ট নয়, কিন্তু শোক কমানোর উপলক্ষ্য তো অবশ্যই। এদিকে রানার মৃত্যুবার্ষিকী আবারো শোক বয়ে আনলেও তাতে বরাবরের মতো জয়ের প্রলেপ ঠিকই দিলো টাইগাররা। তব এবার অঘটন ঘটেই যাচ্ছিলো। কিন্তু তা হতে দেন নি মাহমুদউল্লাহ-সাকিব। তাদের পাশে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন সুজন। রানার মৃত্যুদিনে বরাবর জয়ের দেখা পাওয়ার সেই ধারা বজায় রাখলো টাইগাররা। কারণ, রানা তো শুধু শোকের উপলক্ষ্য না, জয়ের, উৎসবেরও। ওপারে ভাল থাকুন টাইগারদের ছায়াসঙ্গী, মানজারুল ইসলাম রানা।