বেঞ্জামিন অ্যান্ড্রু স্টোকস, ২৯ জুন ২০২৬, বিদায়। ৩ শব্দগুচ্ছে নিশ্চিত বুঝে গেছেন বেন স্টোকসের অবসর নিয়েই আলাপ হচ্ছে। ট্রেন্ট ব্রিজ টেস্টে বিদায়ের রাগিণী বাজিয়ে দিয়ে হুট করেই সব ছেড়েছুঁড়ে যেন পালাতে চাইলেন বেন স্টোকস। এমন আচমকা অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিদায় জানিয়ে দেওয়ার কি খুব তাড়া ছিল বেন স্টোকসের?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরে চলে গেছেন বেন স্টোকস। আপাতদৃষ্টিতে হয়ত ছিল না। চাইলেই আরও ১-২ বছর টেস্ট ক্রিকেটকে প্রাণ ভরে উপভোগ করতে পারতেন বেন স্টোকস। বাজবলের ছন্দে মেতে ইংলিশদের খেলাও উপভোগ করা যেন মন প্রাণ দিয়ে। কিন্তু সেই যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সেই চরণ, ‘যেতে নাহি দিব। হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়!’ বিদায়ের কালে এই কথাগুলোকেই যেন স্মরণ করালেন বেন স্টোকস। যেতে দিতে না চাইলেও চলে যেতে হচ্ছে স্টোকসকে। বিদায় নিচ্ছেন সময়ের অন্যতম সেরা একজন অলরাউন্ডার।
পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায় তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৩৫ গড়ে ১১ হাজারের বেশি রান, ৬২ খানা হাফ সেঞ্চুরি এবং ১৯ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করেছেন বেন স্টোকস। বেশি উজ্জ্বল ছিলেন সাদা পোশাকে, যেখানে ৭ হাজারের বেশি রান। বোলিংয়ে সাড়ে ৩৩ গড়ে উইকেট ৩৫২টি। তবে এতসব রান উইকেটের সংখ্যা দিয়ে পরিসংখ্যানের র্যাঙ্কিং বানানো যায় হয়ত। তবে সত্যিকারের এক নম্বর বা দুই নম্বরের তালিকা বানাতে গেলে এসব তথ্য উপাত্ত ছাপিয়ে নিশ্চিতভাবেই সেরাদের কাতারে থাকবেন বেন স্টোকস।
ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার দলকে মহাচাপের মুখে উদ্ধার করেছেন বেন স্টোকস। এভারেস্টসদৃশ পাহাড় টপকে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার অটলতা বুকে নিয়ে বারবার ইংল্যান্ডকে উদ্ধার করেছেন স্টোকস। কঠিন সব মুহূর্তে দারুণ সব পারফরম্যান্সের কারণেই স্টোকসকে সময়ের সেরাদের কাতারে রাখতেই হবে আপনাকে। ইতিহাসের কাতারেও বা কেন নয়?
২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালের কথাটাই ধরা যাক। আহা, কী দারুণ একটা ম্যাচই না ছিল। ফাইনাল ম্যাচে স্টোকসের ব্যাটে ৯৮ বলে ৮৪ রানের হার না মানা ইনিংস। সাথে সেই বিখ্যাত বনে যাওয়া ব্যাটে লেগে চার হয়ে যাওয়ার ঘটনা। যদিও সেখানে স্টোকসের কোনো কৃতিত্ব নেই, ১ রান বেশি দেওয়ার ঘটনাও পরে ক্রিকেটের আইন ঘেঁটে জানা গেছে। ৫ রান পাওয়ার কথা থাকলেও ৬ রান পেয়ে যায় ইংল্যান্ড, পরে ম্যাচ টাই করে সুপার ওভারে নিয়ে সুপার ওভারও টাই করে ম্যাচ জিতে যায় বাউন্ডারি কাউন্টে। তবে দিনশেষে জয়ী দলের নামটা তো ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেও ইংল্যান্ডের নামই স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা আছে। যেখানে ফাইনালে ম্যাচসেরা হয়ে বীর হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন বেন স্টোকস।
স্টোকসের সেই বিব্রতকর মুহূর্ত, বিশ্বকাপ ফাইনালের টানটান উত্তেজনা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জেতা – ইংলিশদের হৃদয়ে সবকিছুই একেবারে খোদাই করা থাকবে। বিশ্বকাপ জয়ে বেন স্টোকসের অবদানও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্টোকসের সেই ৮৪ রান অন্য যে কারও যেকোনো ৮৪ রানের চেয়ে বেশি মাহাত্ম্য বহন করবে আজীবন। যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
২০১৯ বিশ্বকাপে ব্যাটে লেগে চার হওয়া সেই মুহূর্তে বেন স্টোকস। শিরোনামের বিশ্বকাপ অংশের আলাপ শেষ, এবার হেডিংলি টেস্টে ঢোকা যাক। প্রথম ইনিংসে ৬৭ রানে অলআউট হওয়া ইংল্যান্ডের কাছে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৫৯ রানের লক্ষ্যটা এভারেস্টের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। সেখানে ২৮৬ রানের মধ্যে ৯ উইকেট হারিয়ে ফেলা মানে ম্যাচ এক প্রকার শেষই ভেবে ফেলেছিলেন সবাই। তবে না, সবাই ভাবলেও একজন ভাবেননি। যিনি ভিন্নভাবে ভাবার, তিনি সেভাবেই ভেবেছেন। সেই লোকটা বেন স্টোকস। টেইলএন্ডার জ্যাক লিচকে সাথে বেন স্টোকসের সেই কাউন্টার অ্যাটাক। বুক চিতিয়ে লড়াকু ব্যাটিংয়ে স্টোকসের মহাকাব্যিক সেই ইনিংস বুঁদ হয়ে দেখলো ক্রিকেটবিশ্ব। ২১৯ বলে হার না মানা ১৩৫ রান। সেই সাথে শেষের চারের পর দুই দিকে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে ভুবন জয়ের সেই উল্লাস – বেন স্টোকস তো চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন এসব কারণেই।
ঠিক হেডিংলির মত মঞ্চ প্রস্তুত ছিল ২০২৩ সালের লর্ডসেও। তবে সেবার স্টোকসের ২১৪ বলে ১৫৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংসের পরেও অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৪৩ রানে হেরেছিল ইংলিশরা। ম্যাচটা জিতিয়ে আসতে পারলে হেডিংলি ক্ল্যাসিকের মত করে লর্ডস ক্ল্যাসিকেও ঢুকে যেত স্টোকসের নামটা।
হেডিংলি টেস্ট জেতানোর পর বেন স্টোকস। স্টোকসকে মাহাত্ম্যপূর্ণ করার কারণ আরও অনেক আছে। ধুঁকতে থাকা ক্লান্ত, বিপর্যস্ত এক ইংল্যান্ড টেস্ট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হলো বেন স্টোকসকে। সাথে প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। দুজনের যুগলবন্দীতে টেস্টে বাজবল যুগের সূচনা করলো ইংল্যান্ড। সেই বাজবলের আগ্রাসন, দম্ভ আর প্রভাব এতটাই বিস্তর যে ইংল্যান্ডের খেলার ধরন বদলে গেল প্রায় পুরোটাই, সেই সাথে গোটা টেস্ট ক্রিকেটেও তার ছাপ কিছুটা হলেও পড়তে শুরু করলো। ইংলিশদের বাজবলে বলীয়ান না হলেও কিছুটা আগ্রাসনের বারুদ ছড়িয়ে দিচ্ছে অন্য অনেক দলই। ধ্রুপদী টেস্ট ক্রিকেটে এই যে আগ্রাসনের নতুন অধ্যায়, তার জন্য কি বেন স্টোকস-ব্রেন্ডন ম্যাককালামরা একটা ধন্যবাদ পাওনা নন?
তলানিতে ঠেকা ইংল্যান্ডের টেস্ট দলকে বাজবলের গতিতেই বদলে দিয়েছেন ম্যাককালাম-স্টোকসরা। প্রথম ১২ ম্যাচের মধ্যে ১০টিতেই জয় এনে দিয়েছিলেন ম্যাককালাম। ধীরে ধীরে সেই মধুচন্দ্রিমা মিলিয়ে গেছে যদিও। তবে ভঙ্গুর এক টেস্ট দলকে বাজবলের আগ্রাসনে বদলে দিয়ে কিছুটা হলেও তো স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া গেছে, তা-ও বা কম কীসে?
বাজবলের ধাঁচে অনেকটাই বদলে গেছে ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেট। বাজবলের আলাপ কপচানো হলো অনেক। এবার এবং একজন বেন স্টোকস নিয়েই তো আলাপ চাচ্ছেন? হোক তাহলে। ক্যারিয়ারজুড়ে ফর্মটা ওঠানামার মধ্য দিয়েই গিয়েছে বেন স্টোকসের। এই মহাকাব্যিক কোনো ইনিংস খেলছেন তো পরে আবার ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক চলছে। ক্যারিয়ারে সুখের সময় খুব কমই দীর্ঘায়িত হয়েছে বেন স্টোকসের। যে কারণে বারবার হেরে গিয়েও ফিরে আসার গল্প লিখতে হয়েছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে নিন্দুকদের মুখে তালা মারতে হয়েছে। এমন বারবার হেরে গিয়েও দমে না যাওয়ার কারণেই তো বেন স্টোকস বাকিদের চেয়ে আলাদা।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে একটি ব্যাপার যেন চিরসঙ্গী ছিল বেন স্টোকসের – চোট। কতভাবে কয় উপায়ে যে চোটে পড়েছেন বেন স্টোকস, লিখে মনে হয় না শেষ করা যাবে। এই পায়ের চোট তো এই হাতের আঘাত। আবার মুখে বলের আঘাতে ভয়াবহ দশা। এমন কোনো উপায় বোধ হয় বাকি নেই যেভাবে চোটে পড়েননি বেন স্টোকস। তবুও লড়াই চলেছে ক্রমাগত। নিজের সাথে, চোটের সাথে, ভাগ্যের সাথে এবং আরও অনেক কিছুর সাথে। বারবার চোট থেকে ফিরে এসে নিজেকে ফিরে পাওয়ার যুদ্ধে নেমেছেন বেন স্টোকস। কখনও পেরেছেন কখনও পারেননি, তবে চেষ্টার কমতি ছিন না কোথাও।
বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে এসে টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি নিবেদিত প্রাণ বনে যান বেন স্টোকস। সাদা বলে কিছুটা অনিয়মিত হয়ে পড়েছিলেন ২০১৯ বিশ্বকাপের পর থেকেই। ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতার পর সাদা বল প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিলেন। যদিও ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে অবসর ভেঙে খেলেছেন। তবে এরপর আর না, অলিখিতভাবেই সাদা বলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে দিয়েছেন ফুলস্টপ।
টেস্ট ক্রিকেটে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন বেন স্টোকস। নিবেদিত প্রাণ ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি। ডাক এসেছে আইপিএল থেকে, সেসব ছেড়ে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে দলকে নেতৃত্ব দিতে দেশে ফিরেছেন স্টোকস। তাতে আইপিএলের দরজা পাকাপাকিভাবে বন্ধ হলে হোক। স্টোকসের চাওয়া-পাওয়া সব তো সেই সাদা পোশাকের শ্রেষ্ঠ ফরম্যাট টেস্ট ক্রিকেটকে ঘিরেই।
বেন স্টোকসের জীবনে আরও একটি ব্যাপার অবিচ্ছেদ্য ছিল – বিতর্ক। নানা সময়ে ইংল্যান্ডের নানা ক্লাবে অসদাচরণের কারণে খবরের শিরোনাম হয়েছেন বেন স্টোকস। বিদায়ী টেস্টের ঠিক আগের ম্যাচটাই খেলতে পারেননি সেই কারণে। ফিরে এসে এক ম্যাচ খেলেই জানিয়ে দিলেন অবসরের সিদ্ধান্ত।
সব ছাপিয়ে বেন স্টোকসের ক্যারিয়ারে সবই ছিল। ইংল্যান্ডের সেরা প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সাথে খেলেছেন, নিজের সময়ের সেরা অলরাউন্ডারদের কাতারে ছিলেন, দারুণ কার্যকরী তো ছিলেনই, সেই সাথে দলের জন্য ছিলেন এক নিবেদিত প্রাণ। সাদা বলের দুই ফরম্যাটে বিশ্বকাপ জিতেছে, টেস্ট ফরম্যাটে অ্যাশেজে সিরিজ জেতা না হলেও দারুণ কিছু ম্যাচ তো জিতিয়েছেন।
এমন উদযাপন বেন স্টোকসকেই মানায়। ক্যারিয়ারে তাই তেমন অপ্রাপ্তি নেই বেন স্টোকসের। যার ক্যারিয়ারের হাইলাইটসটা এভাবেই বর্ণনা করা যায় বিশ্বকাপ, হেডিংলি, বাজবল এবং বেন স্টোকস...!