বিদায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের অলরাউন্ডার বেন স্টোকস। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে স্টোকস জিতেছেন অনেক কিছুই, ইংল্যান্ডকে জিতিয়েছেনও অনেক কিছু। অবশেষে ৩৫ বছর বয়সে এসে যেন বললেন, ‘অনেক হয়েছে ব্যস, আর না, বিদায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট!’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরে গেলেন বেন স্টোকস। অধিনায়ক হিসেবে বেন স্টোকস ছিলেন আইকনিক। তার অধীনে এবং প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের টোটকায় টেস্টে বাজবল যুগে প্রবেশ করে ইংল্যান্ড। পানসে, ঘুমপাড়ানি, ঝিমিয়ে পড়া টেস্ট ক্রিকেটের বদলে আগ্রাসনের বারুদ হয়ে যেতে শুরু করে ইংলিশদের টেস্ট ক্রিকেটে। বাজবলের ছোঁয়ায় অনেকটাই বদলে গেছে ইংল্যান্ডের টেস্টের পারফরম্যান্স।
শুরুর ১২ ম্যাচে ১০ জয়ের মত সাফল্যের ধারা পরে ধরে রাখা যায়নি যদিও। তবে সাফল্য তো কিছু এসেছেই। ২০২৩ অ্যাশেজে বুক চিতিয়ে লড়াই, দুর্দান্ত কামব্যাক কিংবা জয়ের মানসিকতায় আগ্রাসী সব সিদ্ধান্ত, শট এসব তো বাজবলেরই ফসল। বেন স্টোকস-ম্যাককালামরা সেই বাজবলে আস্থা রেখেছেন শত প্রতিকূলতার পরেও। আগ্রাসনের বারুদে ইংল্যান্ডের খেলার ধরন বদলে গেছে অনেকটাই। যার প্রভাব কিছুটা পড়েছে গোটা টেস্ট ক্রিকেটেই।
বেন স্টোকস আলাদা ছিলেন অনেক দিক থেকেই। আগ্রাসী নেতৃত্ব, অলরাউন্ডার হিসেবে দলে অবদান রাখা এসব তো ছিলই। মধ্য গগণের তেজী বেন স্টোকসে আস্থা রাখা যেত চোখ বুজে। বারবার খাদের কিনারা থেকে দলকে দারুণ সব জয় এনে দিয়েছেন স্টোকস। হেডিংলির সেই বিখ্যাত হার না মানা ১৩৫ কিংবা ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে স্টোকসের ব্যাটে লেগে চার হয়ে যাওয়ার সেই মহামহাআলোচিত মুহূর্ত – বেন স্টোকসকে মনে রাখতেই হবে আপনার।
বিদায়বেলায় মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে স্কাই স্পোর্টসের সাথে দীর্ঘ আলাপ করেছেন বেন স্টোকস। জানিয়েছেন এমন সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ, নিজের যাত্রাসহ আরও নানা ব্যাপারে।
স্কাই স্পোর্টসকে বেন স্টোকস বলেছেন, ‘আমি কখনোই দলের অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামার কোনো মুহূর্তকে খাটো করে দেখব না। একজন ক্রিকেটার হিসেবে এর চেয়ে বড় সম্মানজনক ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু এর আরেকটি দিকও আছে, যা মানুষ দেখে না, বোঝেও না। শুধু অধিনায়কদের খুব কাছের মানুষরাই সেটা সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারে… এটা আপনাকে নিঃশেষ করে দেয়, নেতিবাচকভাবেও প্রভাবিত করে। সাড়ে চার বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্ত আমি উপভোগ করেছি… তবে কিছু মুহূর্ত অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ছিল। পুরো লর্ডস টেস্টটা আমার ক্যারিয়ারের অবস্থান নিয়ে কিছু নেতিবাচক অনুভূতি আবার ফিরিয়ে এনেছিল।’
স্টোকস আরও বলেছেন, ‘(অ্যাশেজ শেষে) অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফেরার পর সবকিছু ঠিকঠাক করার জন্য আমি ভীষণ পরিশ্রম করেছি। তখন আমার মনে হয়েছিল আমি সেটাই করছি। এতে আমি এত বেশি সময় ও পরিশ্রম দিয়েছি যে, হয়তো শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ক্লান্ত করে ফেলেছি। আমার হাতে যদি খুব বেশি সময় থাকে, সেটা কখনো কখনও আমার জন্য ভালোও হয় না।’
বেন স্টোকসের মতে, ‘লর্ডস টেস্টের সপ্তাহে আমি খুব অদ্ভুত এক অনুভূতির মধ্যে ছিলাম। আমি নিজেকে যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিলাম এটা বোঝার জন্য যে এটা সাময়িক কোনো সমস্যা, নাকি সত্যিই কিছু ঠিক নেই। অবসরের ব্যাপারে যাদের সঙ্গেই কথা বলেছি, সবাই বলেছে - এটা হঠাৎ করেইআপনাকে প্রবলভাবে আঘাত করবে। কয়েক সপ্তাহ আগে আমারও মনে হয়েছিল, ঠিক সেটাই হয়েছে। গতকাল ব্যাটিংয়ে নামার জন্য যখন প্যাড পরছিলাম, তখনই বুঝলাম - এটাই কফিনের শেষ পেরেক।’
নিজের শেষ ইনিংসে ২০ বলে ৩০ রানের ক্যামিও খেলেছেন বেন স্টোকস। অবসরের সিদ্ধান্তটা ট্রেন্ট ব্রিজ টেস্ট চলাকালেই জানিয়েছেন বেন স্টোকস। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঠিক সময় এখনই, মনে করেছেন অধিনায়ক। স্টোকসের মতে, ‘আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, এই সপ্তাহে এসে সেই একই অনুভূতিটা আর ফিরে পাইনি। ব্যক্তিগত জীবনে আমি অনেক কঠিন সময় পার করেছি… এমনও মনে হয়েছে, শুধু এটা করাই উচিত বলে আমাকে করতে হচ্ছে। সত্যি বলতে, এটা হয়তো কিছুটা স্বার্থপর শোনাতে পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা এখন আমার জন্যই সবচেয়ে ভালো। দলের জন্যও এটা ভালো হবে কি না, সেটা আমি আশা করি। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টা হলো -আমি এমন সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছি, যাতে ছোটবেলা থেকে যে খেলাটাকে ভালোবেসে এসেছি, যে খেলাটা আমাকে একটি ক্যারিয়ার দিয়েছে, সেটার প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখতে পারি। সামনে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে পেরে আমি খুবই রোমাঞ্চিত।’
ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে স্টোকস জানিয়েছেন, ‘অনেক দারুণ মুহূর্ত ছিল… অনেক ভালো সময়, আবার অনেক কঠিন সময়ও। আমার মনে হয়, ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় আমি মাঠের হতাশা, মাঠের বাইরের হতাশা - সবকিছুই ভালোভাবে সামলে নিতে পেরেছি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকে আবেগের দিকটা ভিন্ন হয়ে যায়। আমি আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম, সত্যি বলতে, এসব কাটিয়ে ওঠার মতো লড়াই করার শক্তি আমার আর অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না।’
নিজের সাফল্যের পেছনের পরিশ্রমও তুলে এনেছেন স্টোকস। তার মতে, ‘আমরা যে কাজটা করি, সেটা ভীষণ কঠিন - শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে। আমার বয়স এখন ৩৫। মাঠে গিয়ে নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য আমাকে প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। আবার প্রশ্ন আসে, সেই পরিশ্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি বা লড়াই করার মানসিকতা কি এখনও আমার আছে? কারণ আমি জানি, দেশের হয়ে মাঠে নামতে কী পরিমাণ প্রস্তুতি আর ত্যাগ দরকার। আবেগ, শরীর, মন - সবকিছু মিলিয়েই (জীবন) আমাকে এই সিদ্ধান্তের দিকে (অবসরের সিদ্ধান্তের দিকে) নিয়ে এসেছে।’
হেডিংলি টেস্টের সেই মহাকাব্যিক ইনিংসের পর। হেডিংলির টেস্টের ইনিংস স্টোকসের খেলা অন্যতম সেরা তো বটেই, টেস্ট ইতিহাসেরই সেরা ইনিংসগুলোর মধ্যে একটি হয়ে থাকবে। নিজের সেই ইনিংস নিয়ে বিদায়বেলায়ও তৃপ্তি ঝরেছে বেন স্টোকসের কণ্ঠে। তিনি জানালেন, ‘যদি সেটাই সিরিজের শেষ ম্যাচ হতো এবং আমরা ওই ম্যাচ জিতে সিরিজও জিততাম, তাহলে সত্যিই দারুণ হতো। ওটা আমার সবচেয়ে প্রিয় ইনিংসগুলোর একটি। শুধু আফসোস, সেটার মাধ্যমে আমরা সিরিজটা জিততে পারিনি। তবু আমি সবসময় গর্বিত থাকব, কারণ ওই ইনিংসটা আমি খেলতে পেরেছিলাম। ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত আমি উপভোগ করেছি।’
ক্যারিয়ারে অর্জনের ঝুলি বেশ পরিপূর্ণই স্টোকসের। তাই তেমন আফসোসও নেই। সন্তুষ্টি ঝরলো স্টোকসের কণ্ঠে, ‘আমার ক্যারিয়ারে যা কিছু অর্জন করেছি, তাতে আমি খুবই সন্তুষ্ট। আমি অধিনায়কত্ব করেছি, অ্যাশেজ জিতেছি, ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছি, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও জিতেছি। বিশ্বের সেরা কিছু ক্রিকেটারের সঙ্গে একই দলে খেলার এবং দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগও পেয়েছি। তাই অভিযোগ করার মতো তেমন কিছুই নেই।’
বাজবলের দুই আবিষ্কারক। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৩৫ গড়ে ১১ হাজারের বেশি রান, ৬২ খানা হাফ সেঞ্চুরি এবং ১৯ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করলেন বেন স্টোকস। উজ্জ্বল ছিলেন সাদা পোশাকে, যেখানে ৭ হাজারের বেশি রান। বোলিংয়ে সাড়ে ৩৩ গড়ে উইকেট ৩৫২টি।
তবে সব সংখ্যা, পরিসংখ্যান ছাপিয়ে নিজের সময়ের সেরা অলরাউন্ডারদের কাতারে নিয়ে গেছেন অনেক আগেই। দারুণ সব ইনিংসের মঞ্চ এবং পরিস্থিতি তো সেসব ইনিংসের মাহাত্ম্য বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। সর্বকালের সেরার বিচারেও উপরের দিকেই থাকবেন বেন স্টোকস।