নাজমুল হোসেনের কথা মনে আছে? ভেবে দেখুনতো বাংলাদেশ দলের সেই সময়কার কথা। ২০০৪, ২০০৫ সালের দিকে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কার মত পরাশক্তি দলের বিপক্ষে টাইগারদের প্রথম জয়ের স্বাদ। সেই ম্যাচগুলোতে ৯০ নম্বরের ঢিলেঢালা জার্সি পরে প্রতিপক্ষের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানের চোখে চোখ রেখে লড়ছেন এক পেসার। বোলিং মার্ক থেকে দৌঁড় শুরু করার পর উঁকি দিতো গলায় বাঁধা মোটা চেইন।
নাজমুল হোসেনের উদযাপন।
৮ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। তবে বাংলাদেশের হয়ে খুব বেশি মাঠে নামার সুযোগ হয়নি নাজমুলের। ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময়ই লড়েছেন ইঞ্জুরির সাথে। আবার কখনো হয়েছেন অবহেলার শিকার। ৩৭টি ওয়ানডের সাথে মাত্র ২টি টেস্ট ও ৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই থামাতে হয়েছে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষে আফসোস, আক্ষেপ, সম্ভাবনার অপমৃত্যু আর বিদায়ের গল্প শুনিয়েছেন নাজমুল। স্মৃতির পাতা খুলে দিয়েছেন তিনি। নাজমুলের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো
বিডিক্রিকটাইমের পাঠকদের জন্য।
প্রশ্ন: করোনাভাইরাসের এই সময়টা কীভাবে কাটাচ্ছেন?
নাজমুল: আসলে করোনাভাইরাস এভাবে মহামারি রূপ নিবে এটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। আর এমন একটা জিনিস যে আমরা দেখবো তা কখনো চিন্তাও করতে পারিনি। অনেকদিন ধরে গৃহবন্দি বলতে পারেন।
প্রশ্ন: ক্রিকেট থেকে এমন দীর্ঘ বিরতি। উপভোগ করছেন নাকি ক্লান্তিকর মনে হচ্ছে?
নাজমুল: সত্যিকথা বলতে একটু বিরক্তই। কারণ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগটা মাত্রই শুরু হয়েছিল। এক রাউন্ড হয়েছে, এক রাউন্ড হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে যে রিদমটা থাকে বা আর্থিক বিষয়টা যদি ধরেন, তাহলে বড় একটা ক্ষতি আমাদের জন্য। কোচিং স্টাফ আমরা যারা আছি, তারা এখনো কিছুই পাইনি। তো এদিক দিয়ে বলতে পারেন আমরা নিজেরাও অবরুদ্ধ হয়ে আছি।
প্রশ্ন: গতবছরের ২৩ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সবধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। কয়েকদিন পর আরেকটা ২৩ এপ্রিল আসছে। সময়টা দ্রুত কেটে যাচ্ছে?
নাজমুল: আসলে এক সময় খেলোয়াড় ছিলাম, অনেকদিন খেলেছি। তো একজন খেলোয়াড়ের জন্য খেলা ছাড়া দুঃখজনক, আবার বলতে পারেন এটা মেনে নিতে হয়। একটা সময় এসে আসলে সবাইকে ছাড়তে হয়। তো সবকিছু চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদিও সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে, তবে বর্তমানে কোচিং ক্যারিয়ারটা বেশ উপভোগ করছি।
প্রশ্ন: শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বসে হঠাৎ করে অবসরের ঘোষণা যখন দিচ্ছিলেন, তখন ভিতরে কোনো শূন্যতা অনুভব করেছেন?
নাজমুল: বাংলাদেশ জাতীয় দলে দীর্ঘদিন খেলেছি। প্রায় ১৮ বছরের মত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছি। তো এতো দীর্ঘসময় খেলার পরেও যখন দেখছিলাম কোনদিক থেকে কোনো সাপোর্ট পাচ্ছিলাম না, আমিতো এমন একটা জায়গায় চলে গিয়েছিলাম না যে বয়স অনেক বেশি হয়ে গেছে। আবার সর্ব্বোচ্চ ২-৩ বছর খেলতে পারবো। সবকিছু মিলিয়ে দেখলাম যে তরুণ অনেক ক্রিকেটার আসতেছে, তো নিজেই চিন্তা করে দেখলাম, আমরা যদি খেলি এখনো আর যদি জাতীয় দলেই সুযোগ না হয় তাহলে খেলা চালিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না।
[caption id="attachment_72335" align="aligncenter" width="551"]
সতীর্থদের সাথে পেসার নাজমুল হোসেনের উইকেট উদযাপন।[/caption]
প্রশ্ন: তখন বাংলাদেশ ক্রিকেটে বেশ সম্ভাবনাময় পেসার হিসেবে ভাবা হতো আপনাকে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পরেও ইঞ্জুরি খুব বেশি মাঠে নামতে দেয়নি। ক্যারিয়ার শেষে এনিয়ে আক্ষেপ কাজ করে কীনা?
নাজমুল: এটা একটা আক্ষেপ তো অবশ্যই। তবুও যেটা চলে গেছে সেটা আর বলতে চাই না। দেখেন মাশরাফি ভাই যখন জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ছে, যখন উনি ইঞ্জুরি থেকে ফিরে আসছে, তখন উনি কিন্তু জাতীয় দলের জন্য বিবেচিত। তেমন কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। আর আমাদের ক্ষেত্রে যদি বলেন, ২০১২ সালে যে এশিয়া কাপ হলো তখনও কিন্তু আমি দলের সেরা বোলার। এরপর যখন আমি ইঞ্জুরিতে পড়ে আবার ফিরি তখন সবধরণের পরীক্ষা দেবার পর শুনতে হয়েছে, একে না নেওয়াই ভালো। তো মাশরাফি ভাইয়ের সাথে তুলনা করলে আমাদের প্রেক্ষাপট কিন্তু একেবারেই ভিন্ন।
প্রশ্ন: মাশরাফির কথা যেহেতু তুললেন। ২০১৯ সালে যখন অবসর নিলেন, তখন আপনার বয়স ৩১ বছর। অথচ বাংলাদেশ দলেই আপনার সতীর্থ মাশরাফি ৩৬ বছর বয়সে এখনো খেলে যাচ্ছেন। আফসোস হয়?
নাজমুল: আমরা যেই সময়ে ক্রিকেট খেলেছি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেই সময়ের হিসেবে আমরা অনেক ভাগ্যবান। অনেক কিংবদন্তিদের সাথে ক্রিকেট খেলতে পারছি। ধরেন আমি শচীন টেন্ডুলকারের উইকেট দুইবার পেয়েছি। আমি লারার উইকেট পেয়েছি, আমি জয়সুরিয়ার উইকেট পেয়েছি। আমার কাছে এখন মনে হয়, যদি আমি এখন ক্রিকেট খেলতাম, তাহলে আরও অন্তত দুই-তিন বছর বেশি খেলতে পারতাম। এখন শেবাগকে বল করতে হচ্ছে না, এখন গিলক্রিস্টকে বল করতে হচ্ছে না, লারাকে বল করতে হচ্ছে না। আমরা ভাগ্যবান যে এমন কিংবদন্তিদের সাথে খেলতে পারছি। সবেমিলে নিজের কাছে স্বার্থক মনে হয়।
প্রশ্ন: ২০০৪ সালে অভিষেক, শেষবার বাংলাদেশের জার্সিতে মাঠে নেমেছেন ২০১২ সালে। মাঝের সময়ে খুব বেশি সুযোগ হয়নি। ইঞ্জুরি বাদ দিলে অনেকসময় ফিট থেকেও দীর্ঘদিন বাইরে থাকতে হয়েছে। এনিয়ে অভিমান জমেছে কখনো?
নাজমুল: আমি কিন্তু অনেক আগে ক্রিকেট শুরু করেছি। ধরেন বাংলাদেশের যত বড় বড় জয়, ভারতকে প্রথম হারানো, অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম হারানো সবসময়ই কিন্তু আমি ছিলাম বা সেই ম্যাচে খেলেছি। ভালোও করেছি। তবু দেখা গেছে পরের দুইটা সিরিজ বা তিনটা সিরিজ, এমনকি টানা ৭টা ওয়ানডেতে আমি সুযোগ পাইনি। তো পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে এগুলো আসলে অনেক সময় মেনে নিয়েছি আবার মাঝেমধ্যে মেনে নিতে পারি না। আমার ভাগ্য খারাপ ছিল, আমি খেলেছি, একটা কোচ আমাকে চিনেছে তারপর দেখা যায় আবার নতুন একটা কোচ এসছে। এসে অন্যদেরকে পছন্দ করা শুরু করছে।
প্রশ্ন: ভারত, অস্ট্রেলিয়ার মত দলের সাথে বাংলাদেশ যখন প্রথম জয়ের স্বাদ পায়, তখন দলে আপনি নিয়মিত। আপনার অবদানও কম নয়। সে সময়ের কোন স্মৃতি বেশি মনে পড়ে?
নাজমুল: আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। তখন বাংলাদেশের কোচ জেমি সিডন্স। তখনো ওর সাথে আমার সেভাবে পরিচয় হয়নি। সাকিব তখন অধিনায়ক। ত্রিদেশীয় সিরিজে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের আগে সাকিব বলছিল, কোচ আমি উনাকে খেলাবো, তুমি কি বলো? জবাবে সিডন্স বলে, সে যেভাবে বোলিং করে এভাবে বোলিং করলে ব্যাটসম্যান হেঁটে হেঁটে পিটাবে। তো সাকিব এসে আমাকে বলে ভাই এটা বলে কোচ, এখন কী করবেন? বললাম দলে যদি আমাকে নেওয়া হয়, তাহলে খেলব। না রাখলে তো কিছু করার নাই। সাকিব বলে আপনি খেলবেন সব ঝুঁকি আমার। তারপর সিডন্স আমাকে বলে এই ম্যাচে তুমি যদি ভালো কিছু করতে না পারো তাহল আমি থাকাকালীন তুমি আর বাংলাদেশ দলে খেলতে পারবা না। আমি সাকিবকে বললাম, সাকিব আমিতো একটু পর মাঠে নামবো আর এখন সে এগুলা কি বলে! সাকিব আমাকে অভয় দেয়। তো ম্যাচে ওরা (শ্রীলঙ্কা) কিন্তু শুরুর ৬ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়েছিল। যেখানে প্রথম ৩টি পেয়েছিলাম আমি।
প্রশ্ন: ২০০৫ সালে ম্যাথু হেইডেনকে বোল্ড, ২০০৪ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা (৪০ রানে ৪ উইকেট) নাকি ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এমন অগ্নিঝড়া বোলিং। কোনটাকে এগিয়ে রাখবেন?
নাজমুল: ম্যাথু হেইডেনের মত ব্যাটসম্যানের উইকেট পাওয়া সবসময়ই বিশেষ কিছু। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩ উইকেটের এই ম্যাচটা আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের হয়ে যখন খেলতেন তখন ৯০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামতেন। আপনার পর এখন ৯০ নম্বর জার্সি যার গায়ে উঠেছে তিনিও একজন পেসার। বাংলাদেশ দলের হয়ে বোলিং মার্ক থেকে মুস্তাফিজ যখন দৌড় শুরু করে তখনকার অনুভূতি কেমন হয়?
নাজমুল: সত্যি বলতে মুস্তাফিজ যখন ৯০ নম্বর জার্সি পরে বোলিং করে, আমি যখন দেখি, আমার কাছে মনেহয় যে এটা আমারই জার্সি। একসময় আমি এটা পরেই বাংলাদেশ দলে খেলতাম। দেখতে ভালোও লাগে আবার মনে হয় এটা তো আমি না, মুস্তাফিজ খেলতেছে। তবে পেশাদার হয়ে যখন চিন্তা করি, তখন মনে হয় এটা তো ধারাবাহিকতা। একসময় মুস্তাফিজের পরিবর্তে আরেকজন ৯০ নম্বর জার্সি পরে খেলবে।
প্রশ্ন: বর্তমানে কোচিং ক্যারিয়ারে থিতু হয়েছেন। খেলোয়াড় থেকে কোচ, এই পেশা কতটা উপভোগ করছেন?
নাজমুল: আমার ছোট কোচিং ক্যারিয়ারে আমি কিছুটা হলেও সফল। শেষবার প্রিমিয়ার লিগে আমি লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের বোলিং কোচ আর সহকারী কোচ হলাম, তো আমরা সেবার রানার্সআপ হয়েছি। তারপর সুজন ভাই (খালেদ মাহমুদ) আমাকে বললো তোর তো অভিজ্ঞতা আছে তুই কোচিংটা নিয়মিত কর। এরপর এনসিএলে গেলাম সিলেট দলে। সেখানে সহকারী কোচ ছিলাম। সেখানে টায়ার-টু থেকে সিলেটকে এবার চ্যাম্পিয়ন করে টায়ার-ওয়ানে উঠে গেছি।
প্রশ্ন: কখনো বাংলাদেশ জাতীয় দলের বোলিং কোচ হবার স্বপ্ন দেখেন?
নাজমুল: আমরা যে সব লেভেলে ক্রিকেট খেলে এসেছি, তো এখন যদি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনেক বোলিং কোচের সাথে আমাদের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যা মূল্যায়ন করি তাহলে আমরা খুব বেশি পিছিয়ে থাকবো না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের থেকে ভালোও হতে পারে। আমি যেভাবে কাজ করছি ক্রিকেট কোচ হিসেবে, বোলিং কোচ হওয়া আমার পেশা-নেশা সব বলতে পারেন। আমি আপাতত যেভাবে যাচ্ছি তাতে আমার ভবিষ্যতে ইচ্ছে আছে একসময় বাংলাদেশ জাতীয় দলের বোলিং কোচ হিসেবে আসবো। এটা আমার খেলার অভিজ্ঞতা, এটা আমার কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা। সবকিছু মিলিয়ে এটা আমার লক্ষ্য যে বাংলাদেশ দলের বোলিং কোচের দায়িত্ব নেওয়া।