ক্রিকেটে ফিক্সিংয়ের কালো ছায়া এখন আর নতুন কিছু নয়। জুয়াড়িদের প্রলোভনে অনেক ক্রিকেটারের সম্ভাবনাময় কিংবা উজ্জ্বল ক্যারিয়ার থমকে গেছে মাঝপথে। কেউ কেউ ফিরে এসেছেন, তবে কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ক্যারিয়ারে দগদগে ক্ষত বসিয়ে।
সাকিব আল হাসানের ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে- বলার সুযোগ নেই। আইসিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,
বাংলাদেশ দলের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক ফিক্সিংয়ে জড়িত ছিলেন না। তবে তাকে ফিক্সিংয়ের প্ররোচনা দেওয়া হলেও তিনি তা অবহিত করেননি বিসিবি, আইসিসি বা আকসুকে।

আইসিসির দৃষ্টিতে, এটি বড় ধরনের ভুল। বলা যেতে পারে ‘হেয়ালিপনা’। ক্রিকেটকে দুর্নীতি থেকে দূরে রাখতে এই ভুল বা হেয়ালিপনার শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর। সাকিব পেয়েছেন ২ বছরের নিষেধাজ্ঞা। যার মধ্যে মূলত এক বছর মাঠের বাইরে থাকবেন, বাকি এক বছরের শাস্তি শর্তসাপেক্ষে শিথিলযোগ্য অর্থাৎ 'স্থগিতাদেশ'।
সাকিবের নাম যেহেতু ফিক্সিং ইস্যুতে জড়িয়েছে- স্বভাবতই সবার মনে একটি প্রশ্নের উঁকিঝুঁকি বেড়েছে। সেটি হল- ফিক্সিংয়ের আঙিনা মাড়ালেই ক্রিকেটারদের বড় শাস্তি পেতে হয়, কিন্তু বুকি, বাজিকর বা জুয়াড়িরা কেন থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে?

সেই প্রশ্নের উত্তরই জেনে নেওয়া যাক।
বাংলাদেশে জুয়াকে যেভাবে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়, অন্যান্য অনেক দেশেই কিন্তু ব্যাপারটি এমন নয়। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী জুয়া (বেটিং ও সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত ক্যাসিনোও এর আওতাভুক্ত) নিষিদ্ধ। কিন্তু অনেক দেশেই জুয়া বৈধ। কোথাও কোথাও জুয়া অবৈধ হলেও সীমিত ক্ষেত্রে বৈধ- যেমন স্পোর্টস বেটিংয়ে। অর্থাৎ, ক্রীড়াক্ষেত্রে জুয়া অবৈধ নয়। বিশ্ব কাঁপানো জুয়াড়িরা এই সুযোগটিই কাজে লাগান।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, নিজেদের বাঁচানোর মত বেশ কিছু ফাঁকফোকর আছে বলেই জুয়াড়িরা বারবার ক্রিকেটারদের ফাঁদে ফেলেন, এবং তাদের পেশা হিসেবে জুয়াকেই প্রতিষ্ঠিত করে তোলেন। ফিক্সিংয়ের মত অপরাধ থেকে ক্রিকেটকে দূরে রাখতে কাজ করে আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগ, যা আকসু হিসেবে পরিচিত। প্রায় প্রতিটি দল এবং টুর্নামেন্টেই এখন আকসুর উপস্থিতি থাকে। এত কড়া নজরদারির মধ্যেও জুয়াড়িরা পেয়ে যান খেলোয়াড়দের নাগাল। কারণ জুয়াড়িদের এই পেশা স্বীকৃত এবং গ্রহণযোগ্য, তবে ক্রিকেটে নয়।
বেশ কিছু ক্রিকেট খেলুড়ে দেশে ক্রীড়া ইভেন্টে বাজি ধরা বৈধ।
ইংল্যান্ড,
আয়ারল্যান্ড,
অস্ট্রেলিয়া,
দক্ষিণ আফ্রিকা,
শ্রীলঙ্কা ও
নিউজিল্যান্ডে ম্যাচ গড়াপেটার চেষ্টা করলে বাজিকরকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। কারণ এসব দেশে বাজিকরদের কাজ ফৌজদারি অপরাধ তো নয়ই, অপরাধই নয়।
ভারতে জুয়া বা বাজি ধরা অবৈধ। কিন্তু অনলাইনে বেটিং নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই। ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে ভারতীয় বাজিকরদের দৌরাত্ম্যর অন্যতম একটি কারণ এটি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে জুয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু হাস্যকরভাবে- বিদেশি নাগরিক ও পেশাদার জুয়াড়িরা সেখানে জুয়া চালিয়ে যেতে পারবেন। বিশ্বের বাঘা বাঘা জুয়াড়িরা আরব আমিরাতে বসেই খেলোয়াড়দের দিয়ে থাকেন লোভনীয় নানা প্রস্তাব।

জুয়াড়িদের দেওয়া টোপ ক্রিকেটাররা গিলে ফেললে ক্রিকেটীয় আইনে ক্রিকেটারের অপরাধ হলেও উপরে উল্লিখিত দেশগুলোতে জুয়াড়ির কোনো অপরাধ হচ্ছে না। কারণ এটাই তার পেশা। আর এই কারণেই বিভিন্ন সময়ে ক্রিকেটাররা শাস্তি পেয়েছেন ফিক্সিং ইস্যুতে, কিন্তু যিনি মূল হোতা সেই বাজিকররা শাস্তি পাননি।
ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা ভোগ করা বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল জাভেদ নামের এক ভারতীয় জুয়াড়ির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার ফিক্সিংয়ের পেছনে জড়িত ছিলেন এক শ্রীলঙ্কান জুয়াড়িও। অথচ কস্মিনকালেও তাদের শাস্তির কোনো খবর পাওয়া যায়নি, পাওয়া যায়নি পূর্ণ পরিচয়ও। ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে সমালোচিত ও নিন্দিত ফিক্সিংয়ের একটি সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমিরের লর্ডস টেস্টে ফিক্সিং। ঐ ঘটনার মূল হোতা
পাকিস্তান বংশোদ্ভূত দক্ষিণ লন্ডনের জুয়াড়ি মাজহার মজিদ।
নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন শোরগোল ফেলে দিলে
স্কটল্যান্ডে তিনি আটক হন। তবে আইনের মারপ্যাঁচে সহসাই জামিন পেয়ে যান। অথচ বাট-আসিফ-আমির ঠিকই জেল খেটেছেন। ‘ক্রিকেটীয় সাজা’ তো পেয়েছেনই!
কারণ একটাই- ক্রিকেটাররা তাদের পেশাক্ষেত্রে ফিক্সিং করলে সেটি 'অপরাধ' বলে গণ্য হলেও জুয়াড়ির এই আচরণ অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না!
২০০৭ সালে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়ে ফিরিয়ে দেওয়া আশরাফুল পরবর্তী জীবনে কেন ফিক্সিংয়ে জড়ালেন, কিংবা ইতিপূর্বে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি আকসুকে জানানো সাকিব কেন এবার তিন-তিনবার প্রস্তাব পেয়েও চুপ থাকলেন- এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর হল- জুয়াড়িরা ক্রিকেটারদের পিছু ছাড়ে না, তাই একটা সময় ক্রিকেটারদের 'পা পিছলানোর ভয়' থাকেই। সাকিবের সাম্প্রতিক ইস্যুতে আলোচনায় এসেছে আরও কজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারের ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পাওয়ার খবর। সাকিবের মত ছেলেমানুষি না করে তারা বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। সাকিব না জানানোয় পেয়েছেন শাস্তি। অথচ তাকে প্রস্তাব দেওয়া বাজিকর দীপক আগারওয়ালের কোনো শাস্তি হয়নি, হবেও না।
অবশ্য আগারওয়ালদের কল্পিত অবয়বের উপস্থিতি আদৌ আছে কি না সেটিও বড় এক প্রশ্ন। বাজিকরদের কার্যক্রম রহস্য-ঘেরা। দীপক আগারওয়াল ও মাজহার মজিদের মতই আইসিসির কালো তালিকাভুক্ত দুজন জুয়াড়ি অনিল মুনাওয়ার ও ধীরাজ দীক্ষিত। অনেক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে ফেললেও তাদের কোনো শাস্তি হয়নি আজও। কারণ- প্রথমত, তাদের পরিচয় নিয়ে আছে সংশয়; তারা কি সঠিক পরিচয় দিচ্ছেন নাকি ব্যবহার করছেন ছদ্মনাম সেই দ্বিধা তো আছেই, এমনকি দ্বিধা আছে জুয়াড়িদের চেহারা-ছবি নিয়েও। দ্বিতীয়ত, যেভাবে-যেখানে বসে জুয়া পরিচালনা করলে ক্রিমিনাল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সেই হিসেব কষেই বাজিকররা খেলোয়াড়দের সাথে যোগাযোগ করেন। তৃতীয়ত, জুয়াড়িদের কারণে ফিক্সিং না করেও যারা ফেঁসে যান সাকিবের মত, তাদের ক্ষেত্রে বাজিকরের ভূমিকায় কোনো সূক্ষ্ম কৌশল নিয়ে ফন্দি আঁটা ছদ্মবেশী পরিকল্পনাকারী ক্রিকেটারকে বিপদে ফেলার কলকাঠি নাড়ছিলেন কিনা- সেটিও ভাবা হয়।

আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগ আকসুর গণ্ডি ক্রিকেট আঙিনা পর্যন্তই। তারা কঠোর হতে পারে শুধু ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রেই। জুয়াড়িদের ক্ষেত্রে তাদের কঠোর হওয়ার প্রশ্ন ওঠাও আসলে অনুচিত, কারণ খোদ বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বাজিকরদের হাতকড়া পরাতে পারে না বিভিন্ন ফাঁকফোকরের কারণে।
এই বিষয়টি মেনে নিয়েই তাই ক্রিকেটারদের সচেতন হতে বলে আইসিসি বা দেশীয় ক্রিকেট সংস্থাগুলো। সর্বশেষ ইংল্যান্ড (ওয়ানডে) বিশ্বকাপে প্রতিটি দলের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল একজন অতিরিক্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ১২ জন কুখ্যাত জুয়াড়ির ব্যাপারে সব ক্রিকেটারকে সতর্ক কড়া হয়। তাদের নাম-ছবি-মুঠোফোন নম্বর টানিয়ে দেওয়া হয় চোখের সামনে।
এত কড়াকড়ি! অথচ আকসু প্রধান অ্যালেক্স মার্শালকে জুয়াড়িদের সাথে কথা বলতে হয়েছিল এভাবে- 'আপনারা বিশ্বকাপ দেখতে আমন্ত্রিত নন, আপনারা মাঠে আসবেন না, হোটেলেও না, আপনাদের দেখলে আমরা চলে যেতে বলব।'
ক্রিকেটীয় গোলকধাঁধায় ক্রিকেটার ও জুয়াড়িদের ‘অনৈতিক সম্পর্ক’ রক্ষায় তাই জুয়াড়িরাই তৎপর, একইসাথে তাদের নেই ফেঁসে যাওয়ার ভয়ও। খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয়ে বাজি ধরার সুযোগ থাকে বলে বাজিকরদের বাজি ধরার ক্ষেত্রে ‘পাখির চোখ’ ক্রীড়াঙ্গন, বিশেষত ক্রিকেট। একজন বাজিকর যখন কোনো ক্রিকেটারকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেন, তিনি যে জায়গায় বসে প্রস্তাবটি দিচ্ছেন সেই জায়গায় বা এলাকায় বা ক্ষেত্রে হয়ত কাজটি অপরাধ নয়। অপরাধ হবে ক্রিকেটারের; যদি তিনি ফিক্সিং করতে রাজি হয়ে যান, ফিক্সিং করে বসেন কিংবা ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়েও চুপচাপ বসে থাকেন যথাযথ কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে- সাকিবের মত।
তাই ক্রিকেটকে ফিক্সিংমুক্ত রাখা সহজ বিষয় নয়। সহজ নয় জুয়াড়িদের দৌরাত্ম্য কমানোও। এজন্য সচেতন হতে হবে ক্রিকেটার ও ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদেরই।