প্রথম শিরোপা না তৃতীয় স্বপ্নভঙ্গ?

ফাইনাল মানেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের  জন্য যেন শিরোপার স্বপ্নভঙ্গের বেদনাদায়ক স্মৃতি। ২০১২ আর ২০১৬ সালের এশিয়া কাপের ফাইনালেও শিরোপার স্বপ্নে বুক বেঁধে ছিল বাংলাদেশ।  কিন্তু দুইবারই মাঠ ছাড়তে হয়েছে হৃদয় ভাঙার যন্ত্রণা নিয়ে। এবার চোট জর্জরিত বাঘেরা আবারো বুক বেঁধেছে। হার না মানা মানসিকতা আর দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশ প্রমাণ দিয়েছে লড়াকু মনোভাবের। আহত হলেও উজ্জীবিত বাংলাদেশের সামনে প্রথম শিরোপা জেতার সুযোগ।প্রথম শিরোপা না তৃতীয় স্বপ্নভঙ্গ

প্রতিপক্ষ দলটা ভারত। ভারতের বিপক্ষে গত এগারো আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেই কোনো জয়। অনুপ্রেরণার যোগান পেতে সর্বশেষ সুখস্মৃতি ২০১৫ সালের। এশিয়া কাপের সুপার ফোরের লড়াইয়ে ছিল অসহায় আত্মসমর্পণ।

সুপার ফোরে ভারতের বিপক্ষে পরাজয়ের পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮৭ রানে পাঁচ উইকেট আর পাকিস্তানের বিপক্ষে ১২ রানে তিন উইকেট হারানোর পরেও বাংলাদেশ সংগ্রহ করেছে লড়াকু পুঁজি। বোলিংয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ছিনিয়ে এনেছে জয়। তবে সুপার ফোরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভারত ও গ্রুপ পর্বে আফগানিস্তানের বিপক্ষে পরাজয়ের দিনে ব্যাটিং বিপর্যয় সামাল দিতে পারেনি বাংলাদেশ।

Also Read - নিজেকে এত সস্তা ভাবি না : মাশরাফি

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাবনা টপ অর্ডার নিয়ে। এবারের এশিয়া কাপে এখন পর্যন্ত টানা ব্যর্থ হয়েছে টপ অর্ডার। প্রতি ম্যাচে শুরুতেই উইকেট হারিয়ে দলকে বিপদে ফেলে সাজঘরের পথ ধরেছেন ওপেনাররা। গ্রুপ পর্বে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১ রানে ২ উইকেট হারানোর পর পাঁজরের ভাঙা হাড় নিয়ে ১৪৪ রানের বীরত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে উদ্ধারকর্তা রূপে আবির্ভূত হন মুশফিকুর রহিম। এরপর আফগানিস্তানের সাথে ৪৩ রান করতেই গিয়েই বিদায় নেন চার ব্যাটসম্যান।

সুপার ফোরে ভারতের বিপক্ষে ৪২ রানে পতন ঘটেছে তিন উইকেটের। এরপর ধুঁকে ধুকে ১৭৩ রান করেছে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮৭ রানে পাঁচ উইকেট হারানোর পর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ আর ইমরুল কায়েসের জোড়া অর্ধশতকে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।  এরপর মুশফিকুর রহিম ৯৯ রানের ইনিংস খেলে দলকে বাঁচিয়েছেন পাকিস্তানের বিপক্ষে ১২ রানে তিন উইকেট হারানোর পর। প্রতি ম্যাচেই যেন বাংলাদেশ তাকিয়ে থাকে মিডল অর্ডারের কারো দৃঢ়তার জন্য।

লিটন দাস পাঁচ ম্যাচে করেছেন ৬০ রান। এর মধ্যে একটি রয়েছে ৪১ রানের ইনিংস। আরেক ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্ত তিন ম্যাচে করেছেন ২০। সৌম্য সরকার এক ম্যাচ খেললেও রানের খাতা খোলার আগেই ফিরে গিয়েছেন। শুরুতেই উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়া যেন বাংলাদেশের প্রতিদিনের ম্যাচের গল্প।

ভুবনেশ্বর কুমার আর জাসপ্রিত বুমরাহকে নতুন বলে সামলাতে হবে লিটন দাস আর সৌম্য সরকারের। আবারো পুরনো গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটলে পাহাড়সম চাপ সামাল দিতে হবে মিডল অর্ডারকে। টপ অর্ডার দায়িত্বশীল ব্যাটিং করলে বড় স্কোর গড়ার কাজটা অনেকটাই  সহজ হয়ে যাবে বাংলাদেশের জন্য। আর ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে বড় পুঁজির বিকল্প নেই।  মিডল অর্ডারকে মুখোমুখি হতে হবে রবিন্দ্র জাদেজা, যুযবেন্দ্র চাহাল আর কুলদীপ যাদবের ঘূর্ণিধাঁধার।

সব মিলিয়েই ব্যাটিং আর বোলিং- উভয় বিভাগেই দারুণ শক্তিশালী ভারত।

যা নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, সেটাই ভারতের শক্তি। ধারাবাহিকভাবে রান পাচ্ছে টপ অর্ডার। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে বাংলাদেশের তিন ওপেনারের রানের যোগফলের প্রায় পাঁচগুণ শিখর ধাওয়ানের রান। পাঁচ ম্যাচে দুই শতক হাঁকানো ধাওয়ান করেছেন ৩০৭ রান।

এ টুর্নামেন্টে ভারতের সর্বনিম্ন ওপেনিং জুটি ৪৫ রানের যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ওপেনিং জুটির চেয়েও বেশি। পাকিস্তানের বিপক্ষে ২১০ রানের ওপেনিং জুটি গড়েছিলেন ধাওয়ান আর রোহিত শর্মা। এ দুইজনকে বিশ্রাম দেয়ার পর লোকেশ রাহুল আর আম্বাতি রাইডু ওপেনিংয়ে নেমে আফগানিস্তানের বিপক্ষে গড়েন ১১০ রানের জুটি। তাই ভাওরতের টপ অর্ডারকে দ্রুত ফেরানো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের বোলারদের জন্য। তাদের টপ অর্ডারকে যত দ্রুত সাজঘরে ফেরানো যাবে, বাংলাদেশের জন্য ততই মঙ্গল।

বোলিংয়ে দারুণ ছন্দে আছেন মুস্তাফিজুর রহমান। বেশ কার্যকরী বোলিং করছেন অফস্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। নতুন বলেও করছেন দারুণ। তাই ভারতের টপ অর্ডারকেও মুখোমুখি হতে হবে কঠিন পরীক্ষার।

বাংলাদেশের আরেক সমস্যা চোট। হাতে ব্যথা পেয়ে টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ খেলেই দেশে ফিরেছেন ওপেনার তামিম ইকবাল। অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান আঙুলের চোটের কারণে ফাইনালের আগেই ফিরে এসেছেন দেশে। পাঁজরের ভাঙা হাড় নিয়ে দারুণ ব্যাটিং করছেন মুশফিকুর রহিম। কিপিংয়ে উজাড় করে দিচ্ছেন নিজের শতভাগ। মুস্তাফিজুরের বলে দারুণ এক ক্যাচ নেয়ার পর জেঁকে বসেছে পুরোনো ব্যথা।  পাকিস্তানের বিপক্ষে অসাধারন এক ক্যাচ নিয়ে আঙুলে ব্যথা পেয়েছেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা।  তবে এত চোটের পরেও উজ্জীবিত বাংলাদেশ। শত ঘাত-প্রতিঘাত থাকলেও লড়াকু মনোভাব নিয়েই মাঠে নামছে টাইগাররা।

সাকিব আল হাসান না থাকায় বোলিং আক্রমণের ধারটাও যেন কমে এসেছে। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে তা বুঝতে দেননি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ আর সৌম্য সরকার। দুজন দারুণ বোলিং করে সাকিবের অভাব পূরণ করে দিয়েছেন। ভারতের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বল হাতে দায়িত্ব নিতে হবে তাদের।

এশিয়া কাপে এখন পর্যন্ত অপরাজিত ভারত।  তাদের হারাতে হলে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার বিকল্প নেই। টাইগারদেরও তা ভালো করেই জানার কথা। ২০১৬ এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের কাছে হেরেই ভেঙেছিল স্বপ্ন। সেই ভারতকে হারিয়েই শিরোপার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ বাংলাদেশের সামনে।  একের পর এক হৃদয় ভাঙার গল্পের অবসান ঘটিয়ে অধরা শিরোপা অর্জনের আরেকটি সুযোগ।

সম্ভাব্য একাদশঃ

বাংলাদেশঃ লিটন কুমার দাস, সৌম্য সরকার, মোহাম্মদ মিঠুন, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, ইমরুল কায়েস, মেহেদি হাসান মিরাজ, মাশরাফি বিন মুর্তজা (অধিনায়ক), রুবেল হোসেন এবং মুস্তাফিজুর রহমান।

ভারতঃ শিখর ধাওয়ান, রোহিত শর্মা (অধিনায়ক), আম্বাতি রাইডু, মহেন্দ্র সিং ধোনি,  দীনেশ কার্তিক,  কেদার যাদব,  রবিন্দ্র জাদেজা, ভুবনেশ্বর কুমার, কুলদীপ যাদব, যুযবেন্দ্র চাহাল এবং জাসপ্রিত বুমরাহ।

Related Articles

এই মিরাজ অনেক আত্মবিশ্বাসী

মিঠুনের ‘মূল চরিত্রে’ আসার তাড়না

‘আঙুলটা আর কখনো পুরোপুরি ঠিক হবে না’

এক নয় মাশরাফির তিন ইনজুরি

‘বিশ্ব ক্রিকেটে সম্মানজনক জায়গা আদায় করেছে বাংলাদেশ’